খনিজ সম্পদের নতুন ‘পাওয়ার হাউস’ হওয়ার পথে সৌদি আরব । ভূমিকা টিভি

তেলের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে খনিজ সম্পদ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগে এগোচ্ছে সৌদি আরব। দেশটির সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভূগর্ভে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার সমমূল্যের খনিজ সম্পদ মজুত রয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

সৌদি আরবের খনিজ ভান্ডারে রয়েছে স্বর্ণ, দস্তা, তামা ও লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতু। পাশাপাশি দেশটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রেয়ার আর্থ বা বিরল মৃত্তিকা খনিজ পাওয়া গেছে, যা আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক যান, উইন্ড টারবাইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি এবং উন্নত সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে এসব খনিজের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।

বর্তমানে বৈশ্বিক বিরল মৃত্তিকা বাজারের প্রায় ৯৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে চীন। তবে সৌদি আরবের বিপুল খনিজ সম্ভাবনা এই একচেটিয়া আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

রিয়াদে অনুষ্ঠিত ‘ফিউচার মিনারেলস ফোরাম’–এ বিশেষজ্ঞরা জানান, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগের ফলে চীন এ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে। তবে সৌদি আরবও পিছিয়ে নেই। গত কয়েক বছরে দেশটি খনিজ অনুসন্ধান ও উন্নয়ন খাতে বাজেট প্রায় ৫৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে।

সৌদি সরকারের ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনায় খনি শিল্পকে অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত খনি কোম্পানি মাআদেন জানিয়েছে, আগামী ১০ বছরে খনি ও ধাতু খাতে প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। যদিও খনিজ উত্তোলন ও পরিশোধন একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, যার পূর্ণ সুফল পেতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে।

সৌদি আরবের এই খনিজ কৌশল যুক্তরাষ্ট্রেরও বিশেষ আগ্রহ কেড়েছে। বিশেষ করে বিরল খনিজে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ওয়াশিংটন রিয়াদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে। গত নভেম্বরে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়, যার বড় অংশই খনিজ সহযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এরই অংশ হিসেবে পেন্টাগনের সহায়তায় মার্কিন প্রতিষ্ঠান এমপি মেটেরিয়ালস সৌদি আরবে একটি নতুন খনিজ শোধনাগার স্থাপনে মাআদেনের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র খনিজ প্রক্রিয়াকরণে চীনের আধিপত্য কমাতে চায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বল্পমূল্যের জ্বালানি ও আরামকোর মতো অভিজ্ঞ শিল্প প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সক্ষমতা। এসব শক্তি কাজে লাগিয়ে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াকরণ হাবে পরিণত হতে পারে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবেশগত ঝুঁকির মতো চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের খনিজ খাতে এই বিনিয়োগ কেবল অর্থনৈতিক লাভের জন্য নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়ানোর একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

Leave a Comment