নীলফামারীতে প্রস্তাবিত এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি আধুনিক ও কৌশলগত চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু দেশের রোগীরাই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষও এখানে উন্নত চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ পাবে।
রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর সভায় নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
প্রকল্প অনুমোদনের পর তিনি বলেন, এই হাসপাতাল কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের জনগণ নিজ জেলাতেই বিশেষায়িত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাবে।
তিনি আরও বলেন, রংপুর ও ঢাকা-কেন্দ্রিক হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি। নীলফামারীর এই হাসপাতাল সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি নেপাল ও ভূটানসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর রোগীরাও এখানে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা নিতে পারবে, যা আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজস্ব খাতে প্রায় ৮৯৩ জন চিকিৎসক, ১ হাজার ১৯৭ জন নার্স এবং ১ হাজার ৪১০ জন অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উদ্যোগে এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের বাস্তবায়নে প্রকল্পটি জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ সময়কালে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৫৯.৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ১৭৯.২৭ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট অর্থায়ন আসবে চীনা অনুদান সহায়তা থেকে।
এর আগে গত বছরের মার্চ মাসে চীন সফরকালে প্রধান উপদেষ্টা চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের কাছে বাংলাদেশে একটি আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের অনুরোধ জানান। সেই অনুরোধের প্রেক্ষিতেই চীন সরকার দ্রুত এই উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এই হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, অনকোলজি, নিউরোলজি সহ বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি আধুনিক জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, সিসিইউ ও এইচডিইউ, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং আধুনিক অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় একটি ১০ তলা মূল হাসপাতাল ভবন, অধ্যাপক ও সিনিয়র চিকিৎসকদের জন্য ১০ তলা আবাসিক ভবন, চিকিৎসকদের জন্য ১০ তলা ডরমেটরি, দুই তলা ডুপ্লেক্স ডিরেক্টরস বাংলো, দুটি ৬ তলা নার্স ডরমেটরি এবং দুটি ১০ তলা কর্মচারী কোয়ার্টার ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হবে।
নীলফামারী জেলায় বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ মানুষের বসবাস, যাদের বড় অংশ গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায় বসবাস করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী এই জনসংখ্যার জন্য ৪,৫০০ থেকে ৬,০০০ শয্যার প্রয়োজন হলেও বর্তমানে জেলা পর্যায়ে বিদ্যমান শয্যা সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
বিশেষায়িত বিভাগ ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার অভাবে গুরুতর রোগীদের রংপুর কিংবা ঢাকায় যেতে হয়, যা সময় ও ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি রোগীর ঝুঁকিও বৃদ্ধি করে। উত্তরাঞ্চলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস, মাতৃ ও নবজাতক জটিলতার মতো রোগ দ্রুত বাড়ছে, যেগুলোর জন্য উন্নত চিকিৎসা ও ইনটেনসিভ কেয়ারের প্রয়োজন।
বর্তমানে জেলার স্বাস্থ্যসেবা মূলত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠানে আইসিইউ, ডায়ালাইসিস, ক্যান্সার ইউনিট, নিউরো ও কার্ডিয়াক কেয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা সীমিত থাকায় গুরুতর রোগীদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়।

