যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত ওই লেখায় বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ‘সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘অ্যান ইন্টারভিউ উইথ তারেক রহমান—লাইকলি বাংলাদেশ’স নেক্সট প্রাইম মিনিস্টার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে পরিচালিত একাধিক জনমত জরিপের ফল তুলে ধরে তারেক রহমানকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা নেতৃত্ব হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।
এর আগেও ব্লুমবার্গ, টাইম ও দ্য ইকোনমিস্টের মতো প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তারেক রহমানকে আসন্ন নির্বাচনের শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দ্য ডিপ্লোম্যাট তাদের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে জানায়, টানা ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর ওই আন্দোলন দেশের বিভিন্ন শ্রেণি ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে একত্রিত করেছিল। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মাদ্রাসার ছাত্র এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের কর্মীরা অংশ নেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর দমননীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তার সরকারের পতন ঘটে এবং একটি গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আশার দ্বার উন্মোচিত হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একই দিনে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নির্ধারণে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যা দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের বড় অংশ হবে জেনারেশন জেড বা জেন জি। অর্থাৎ দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জেন জি ভোটার বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন, বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আয়োজিত কার্যক্রমগুলোতে।
প্রতিবেদনে কয়েকটি জনমত জরিপের ফলাফল উল্লেখ করে বলা হয়, নির্বাচনে বিএনপির শক্ত অবস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। ডিসেম্বর মাসে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯ শতাংশ, আর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতি সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ।
এছাড়া ইনোভেশন কনসালটিং পরিচালিত আরেকটি জরিপে উঠে আসে, ৪৭ শতাংশের বেশি মানুষ তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য নেতা হিসেবে দেখছেন। একই জরিপে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সিরাজগঞ্জে একটি নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেওয়ার পর টাঙ্গাইলের আরেকটি সমাবেশে যাওয়ার পথে বাসযাত্রাকালে দ্য ডিপ্লোম্যাট তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করে। সে সময় তিনি অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
জেন জি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি তরুণ প্রজন্মের চিন্তাভাবনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছে। তিনি জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলা, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং শ্রমবাজারকে তারা বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, যা তরুণদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, জনসভাগুলোতে উপস্থিত অধিকাংশ মানুষই তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি।
তিনি জানান, ‘দ্য প্ল্যান’ নামে একটি উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি সরাসরি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, যেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ভাবনা, উদ্বেগ ও প্রস্তাব তুলে ধরেন। তরুণদের সঙ্গে এই যোগাযোগকে তিনি উপভোগ করেন বলেও মন্তব্য করেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারতের প্রতি ঝুঁকে থাকা পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সমালোচনা ছিল। এ বিষয়ে দ্য ডিপ্লোম্যাট তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থই হবে পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’— যেখানে অর্থনীতি নির্ভর কূটনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও লাভের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি।
রাজনৈতিক সহনশীলতা ও নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিএনপি সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করবে এবং রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখবে। আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ভোট প্রসঙ্গে দ্য ডিপ্লোম্যাট স্মরণ করিয়ে দেয়, জেন জি ভোটারদের একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দিকে ঝুঁকছে, যারা ভবিষ্যতে বিএনপির জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, তিনি এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন না। জনগণের কাছে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরা এবং জনগণের রায় মেনে নেওয়াই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান বলেন, এটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এজন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল হলেও ভবিষ্যতে আইটি খাত, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, জুতা শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) বিনিয়োগ বাড়ানো হবে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কৃষিপণ্য রপ্তানি ও সৃজনশীল অর্থনীতিতেও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
ঋণখেলাপি ও অর্থপাচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শক্তিশালী আর্থিক শাসন ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার অঙ্গীকারও করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বিএনপির লক্ষ্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন থাকবে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তারেক রহমান বলেন, দায়িত্বশীল সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করা হবে। খাল খনন ও ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি তাদের ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করবে— যেখানে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শেষে তারেক রহমান বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হবে এবং জনগণের ক্ষমতাই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।