আইসিসি থেকে যা পাবে বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি), বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) মধ্যে চলমান টানাপোড়েনের অবসান ঘটেছে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতে সম্মতি দিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট দল। গতকাল (৯ ফেব্রুয়ারি) পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির সঙ্গে বৈঠকের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। আলোচনার মাধ্যমে আইসিসি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উত্থাপিত একাধিক শর্ত মেনে নিয়েছে।
এই সংকটের সূত্রপাত হয় বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশনায় আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স তাদের দল থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দেয়। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ দেশীয় টেলিভিশনে আইপিএল সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দেখিয়ে ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ।
এরপর বিসিবি আইসিসিকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের আবেদন জানায়। তবে সময়স্বল্পতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি সংক্রান্ত বাস্তব প্রমাণের অভাব দেখিয়ে আইসিসি সেই আবেদন নাকচ করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সিদ্ধান্তের পরই দৃশ্যপটে সক্রিয়ভাবে আসে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড।
আইসিসির বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ তুলে প্রথমে বিশ্বকাপ বয়কটের ইঙ্গিত দেয় পিসিবি। পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার ঘোষণা দেয় তারা। এতে চাপে পড়ে যায় আইসিসি। কারণ আর্থিক দিক থেকে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি আইসিসির সবচেয়ে লাভজনক আয়োজনগুলোর একটি। এই ম্যাচ বাতিল হলে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইসিসি জরিমানা, শাস্তি এমনকি সদস্যপদ স্থগিতের হুমকিও দেয়, পাশাপাশি শুরু হয় সমঝোতার আলোচনা।
অবশেষে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) আইসিসি, পিসিবি ও বিসিবি ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় বসে। সেখানেই সংকট নিরসনের পথ তৈরি হয়। পরদিন রাতে পিসিবি চেয়ারম্যান আবারও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার চূড়ান্ত সম্মতি জানান।
এরপর আইসিসি এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নিতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে জানানো হয়, বিশ্বকাপ বর্জনের ঘটনায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। বিবৃতিতে ২০ কোটির বেশি সমর্থকের বাংলাদেশের ক্রিকেট বাজারের উন্নয়নে আইসিসির সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। আলোচনায় শুধু চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেটের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়।
বিশ্বকাপে খেলতে না পারায় ক্ষতিপূরণের দাবি তোলে বিসিবি ও পিসিবি। তবে আইসিসি সেই দাবি গ্রহণ করেনি। যদিও আলোচনার ফল হিসেবে বাংলাদেশের প্রাপ্তি পুরোপুরি শূন্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইসিসির বিবৃতি অনুযায়ী—
বিসিবির ওপর কোনো শাস্তি বা জরিমানা কার্যকর হবে না:
তিন পক্ষের আলোচনায় একমত হওয়া হয়েছে যে, এই ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ওপর কোনো আর্থিক, ক্রীড়াগত কিংবা প্রশাসনিক শাস্তি আরোপ করা হবে না। একই সঙ্গে আইসিসির বিধি অনুযায়ী বিসিবির বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটিতে (ডিআরসি) যাওয়ার অধিকার বহাল থাকবে।
২০২৮–২০৩১ সময়কালে একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ:
সমঝোতার অংশ হিসেবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ২০৩১ সালের পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশ একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ পাবে, যা আইসিসির স্বাভাবিক নির্বাচন প্রক্রিয়া, সময়সূচি ও পরিচালনাগত শর্ত পূরণসাপেক্ষে বাস্তবায়িত হবে। উল্লেখ্য, ২০৩১ সালের বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করবে বাংলাদেশ ও ভারত।
বিবৃতিতে আইসিসি বাংলাদেশের আয়োজক সক্ষমতার ওপর আস্থা প্রকাশ করে এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আয়োজক হওয়ার সুযোগ বাড়ানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
আইসিসির প্রধান নির্বাহী সনযোগ গুপ্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়,
“টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। তবে এটি বাংলাদেশের প্রতি আইসিসির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিকে পরিবর্তন করে না। বিসিবিসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে আমরা বাংলাদেশের ক্রিকেটের টেকসই উন্নয়ন এবং খেলোয়াড় ও সমর্থকদের জন্য ভবিষ্যৎ সুযোগ আরও জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

Leave a Comment