আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। তবে নির্বাচনি মাঠে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচারে স্পষ্ট ভিন্নতা চোখে পড়ছে।
সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর সরব প্রচারের বিপরীতে গণভোট অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্ব হারিয়েছে। বিশেষ করে গণভোটে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও বিএনপির প্রচারণায় নীরবতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১১ দলীয় জোট গণভোটকে সামনে রেখে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে।
বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকার ঘোষণা দিলেও মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সংসদ সদস্য প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে গণভোটে কী অবস্থান নেওয়া হবে—এ প্রশ্নের মুখে পড়ছেন অনেক নেতা। কেউ কেউ জানিয়েছেন, ভোটারদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তারা সংকটে পড়ছেন।
বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতা জানান, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা না পেলেও ভোটাররা জানতে চাইলে তারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেই কথা বলছেন। তবে অনেক এলাকায় কেবল দলীয় প্রতীকের পক্ষে ভোট চাওয়া হচ্ছে, গণভোট প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট গণভোটকে তাদের প্রচারের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত করেছে। তারা নির্বাচনি সভা, গণসংযোগ ও প্রচারপত্রে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। অনেক প্রার্থীর ব্যানার ও লিফলেটেও গণভোটের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারও গণভোটের পক্ষে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। ভোটারদের সচেতন করতে সরকারের উপদেষ্টারা বিভিন্ন জেলায় সফর করছেন। সব সরকারি দপ্তরকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয় গণভোট বিষয়ে প্রচার কার্যক্রম জোরদার করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচারণা চলছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণয়ন করে। পরে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ওই অধ্যাদেশ অনুযায়ী গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গণভোটের তফসিলও ঘোষণা করা হয়। একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং সংসদ নির্বাচনের ভোটাররাই গণভোটে ভোট দেবেন।
তফসিল ঘোষণার পর সংসদ নির্বাচনের প্রচারে বিধিনিষেধ থাকলেও গণভোটের প্রচারে আইনগত কোনো বাধা ছিল না। এ সময় জামায়াত, এনসিপি ও জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার শুরু করলেও বিএনপি কার্যত নীরব ছিল। ২২ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলে ১১ দলীয় জোট গণভোট ইস্যুকে আরও জোরালোভাবে সামনে আনে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান একাধিক নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দিলেও গণভোট প্রসঙ্গে কোনো দিকনির্দেশনা দেননি। একইভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি প্রার্থীদের প্রচারেও গণভোট বিষয়ে তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি।
তবে বিএনপির কিছু নেতা দাবি করছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এক সভায় বিএনপির অবস্থান ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বলে উল্লেখ করেন, যদিও সরাসরি ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাননি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গণভোটের মূল বিষয়বস্তু ও প্রশ্ন কাঠামো নিয়ে বিএনপির আপত্তি রয়েছে। তারা মনে করছে, জুলাই সনদে দেওয়া তাদের কিছু ভিন্নমত গণভোটে প্রতিফলিত হয়নি। এ কারণেই প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ বললেও প্রচারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে দলটি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ১১ দলীয় জোট গণভোটকে জুলাই বিপ্লবের চেতনার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। সভা-সমাবেশ, ডিজিটাল ক্যাম্পেইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চলছে। জোটের নেতারা বলছেন, সংস্কার বাস্তবায়ন ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সফলতার জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী করা জরুরি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ছিল উভয় বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। গণভোট বিষয়ে নীরবতা বা অস্পষ্টতা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।